ঢাকার কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস। ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ হোসেন, ঘুষের টাকায় হয়েছেন কয়েক কোটি টাকার মালিক নামে বেনামে সম্পদ করেছেন তিনি। এখানে সেবাগ্রহীতাদের কাগজপত্র যাচাই করছেন বহিরাগত বেশ কিছু লোকজন, তাঁরা কেউই ওই অফিসের কর্মচারী নন। স্থানীয় লোকজনের কাছে উমেদার নামে পরিচিত হলেও মূলত তাঁরা ‘দালাল’। রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস ঘিরে তৎপর এমন দালালের সংখ্যা অন্তত ৩০ জন। তাঁদের কাজ ভূমি অফিসের কর্মচারীদের যোগসাজশে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করা। এমনকি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও থাকে তাঁদের জিম্মায়। ঘুষ ছাড়া সেবা মেলে না এখানে, এই অফিসে পা বাড়ালে জমির মালিকদের জন্য পদে পদে অপেক্ষা করে হয়রানি। এ জন্য অনেকে ভূমি অফিস এড়িয়ে চলতে চান। জরুরি প্রয়োজনে দালালেরাই হয়ে ওঠেন সমাধান।
জমির কাগজসংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা সমাধানে প্রথমেই যেতে হয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। পরের ধাপে সেবা দেয় উপজেলা ভূমি অফিস। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন এসব অফিসের দেওয়া সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে—ভূমিহীনদের মাঝে কৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত, খতিয়ানের ভুল সংশোধন, নামজারি ও জমাভাগ, ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণীর আপত্তি-নিষ্পত্তি, দেওয়ানি আদালতের রায় বা আদেশমূলে রেকর্ড সংশোধন, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের আবেদন নিষ্পত্তি, জমা একত্রকরণ ও বিবিধ কেসের আদেশের নকল বা সার্টিফায়েড কপি প্রদান ইত্যাদি।
এসব সেবা নিতে জমির মালিকদের অনেককেই দালালের দ্বারস্থ হতে হয় বলে স্বীকার করেছেন রোহিতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ হোসেন তিনি বলেন, ‘ভূমি ব্যবস্থাপনায় আগে থেকে দালাল চক্র জড়িত। কিছু ভূমির মালিক নামজারি করতে দালালদের দায়িত্ব দেন। তা ছাড়া কাজের চাপে পড়লে আমরাও তাঁদের সহযোগিতা নিই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে
সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে দালালের মাধ্যমে যে টাকা নেন, তা ভাগ-বাঁটোয়ারাও হয় নানা ধাপে। এই ভূমি অফিসে তৎপর এক দালাল জানান, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ হোসেন তাদেরকে বলেন ঘুষের টাকার ৫০ শতাংশই দিতে হয় সহকারী কমিশনার (ভূমি), ৩০ শতাংশ কানুনগো, সার্ভেয়ার ও নামজারি সহকারী, আর ২০ শতাংশ পান দালাল।
গনমাধ্যম কর্মীরা সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে মোহাম্মদ হোসেন তার পালিত গুন্ডা বাহিনী দিয়ে ভয় ভীতি দেখিয়ে সংবাদ প্রদানে বাঁধা প্রদান করে।
ভূমি অফিসগুলোয় সেবা পেতে কী কী ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয় তা জানতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ভূমি অফিসেই ঘুষ লেনদেন, চরম ভোগান্তি ও দালালের দৌরাত্ম্য চোখে পড়েছে, রেকর্ড রুমে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন বহিরাগত দালাল ।
ঘুষ ছাড়া জমির নামজারি হয় না কাগজপত্র ঠিক থাকলেও টাকা ছাড়া ফাইল সহকারী কমিশনারের (ভূমি) টেবিলে পৌঁছায় না। কাগজপত্রে গরমিল থাকলে গুনতে হয় কয়েকগুণ বেশি টাকা।
এই অফিসে সেবা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন একজন ভুক্তভোগী জানান , একটি জমি কিনে নামজারি করতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অনলাইনে আবেদন করেছিলাম। সরকারি ফি ১ হাজার ১৫০ টাকা হলেও ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে দিতে হয়েছে বাড়তি ১৫ হাজার টাকা। এমন আরো ভুক্তভোগী আছেন যারা বিশ হাজার ত্রিশ হাজার ৫০ হাজার টাকা দিয়েও দিনের পর দিন ঘুরতে হয়েছে।
মোহাম্মাদের কাছে ডিজিটাল সেবাও ঝুলে থাকে টাকার জন্য
ভূমি অফিসের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অনলাইনে সেবা চালু করেছে সরকার। এর মধ্যে জমির নামজারি, খাজনা ও মিসকেস সেবা অন্যতম। ভুক্তভোগীরা বলছেন, অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অনলাইনে আবেদনের পর আবার মূল কাগজপত্র নিয়ে ভূমি অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। তখন টাকা না দিলে অনলাইনে ঝুলে থাকে ফাইল।
জমিতে কেউ নতুন মালিক হলে তাঁর নাম খতিয়ানভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে নামজারি বলে। অনলাইনে নামজারির জন্য প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ওয়েবসাইটে ঢুকতে হবে। তারপর ৭০ টাকা ফিসহ নামজারির আবেদন ফরম পূরণ করে জমা দিতে হবে। অনলাইনে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস তদন্ত করে উপজেলা ভূমি অফিসে নাম প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু এই নাম প্রস্তাব পাঠানোর জন্য ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জমি অনুপাতে ১ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি টাকা নেন।কখনো কাগজে ঝামেলা বুঝে ইচ্ছামত দর কষিয়ে নেন। এছাড়া দুর্নীতিবাজ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেনের দুর্নীতি ও ঘুষের টাকার সম্পদের ফিলিস্তি নিয়ে পরবর্তী পর্বে থাকছে বিস্তারিত। চলবে
Leave a Reply